মাদকাসক্তদের তাণ্ডবে এসআই হত্যা; ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলছে র্যাব
পুলিশ পরিচয় দিয়েও রক্ষা পেলেন না

সাভারের আমিনবাজারে তুচ্ছ বিরোধের জেরে মাদকাসক্ত একদল যুবকের তাণ্ডবে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। হামলাকারীদের পাঁচজন প্রথমে একটি গ্যারেজের সামনে বিরোধে জড়ালেও পরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসহ ২৫ থেকে ৩০ জন সেখানে জড়ো হয়ে এসআই আলতাফ ও তাঁর ছেলে আরিফুলের ওপর হামলা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে একটি পোশাক কারখানায় আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি তিনি। হামলাকারীরা কারখানার গেট ভেঙে ঢুকে দেশীয় অস্ত্র, এসএস পাইপ ও চাকু দিয়ে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে র্যাব বলছে, আলতাফ হোসেনকে পুলিশ হিসেবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়নি; ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিতও নয়, বরং তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত একটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত এজাহারভুক্ত ১৫ আসামির অধিকাংশেরই কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। হামলার সময় তারা মাদকাসক্ত ছিল বলেও প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।
র্যাব জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে সাভারের আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। একটি প্রাইভেটকারে থাকা পাঁচ যুবকের সঙ্গে একটি অটো রিকশা গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদের বিরোধের সূত্রপাত হয়। অটো রিকশাটি গ্যারেজের সামনে রাখাকে কেন্দ্র করে ওই যুবকেরা গ্যারেজের বৃদ্ধ মালিককে থাপ্পড় ও মারধর করে।
বিষয়টি দেখে প্রতিবাদ করেন এসআই আলতাফ হোসেন। তিনি ওই এলাকায় ছিলেন এবং মানবিক কারণে গ্যারেজের মালিককে মারধর ঠেকাতে এগিয়ে যান। এ সময় তাঁর ছেলে আরিফুলও সেখানে ছিলেন। হামলাকারীদের সঙ্গে বাবা-ছেলের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে আলতাফ হোসেন নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু এতে হামলাকারীরা পিছু না হটে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে দৌড়ে ছেলের ছোট পোশাক কারখানায় আশ্রয় নেন তিনি। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন।
কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে হামলাকারী ওই পাঁচজন এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ফোন করে ডেকে আনে। পরে আরও লোকজন সেখানে যোগ দেয়। একপর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল কারখানার সামনে জড়ো হয়। তারা কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে আলতাফ হোসেনের ওপর হামলা চালায়।
হামলাকারীরা এসএস পাইপ, চাকু, হাতুড়ি ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে। এ সময় আলতাফ হোসেনের চিৎকার শুনে তাঁর ছেলে আরিফুল পেছন দিক থেকে এসে বাবাকে রক্ষার চেষ্টা করেন। হামলাকারীরা তাকেও ফেলে দিয়ে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। হামলায় কারখানার মেশিন ও আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়।
পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসআই আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ছেলে আরিফুল গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নেন।
৮ আসামি গ্রেপ্তার
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা হওয়ার পর আসামিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে র্যাব।
র্যাব-১০ জানায়, এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০) ও ইমরান (২৬)। তাঁদের মধ্যে আপন সাভার থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মাদক মামলার আসামি।
অন্যদিকে র্যাব-৪ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চার এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪), মো. রাকিব মিয়া (২৮), ছাব্বির আহমেদ (২৪) ও মো. ওয়াসিম (৪০)।
‘পুলিশ হিসেবে টার্গেট করা হয়নি’
র্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এসআই আলতাফ হোসেনকে পুলিশ হিসেবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়নি। ঘটনার শুরুতে তিনি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে গ্যারেজের মালিককে মারধরের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলাকারীদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, ঘটনাটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে না। একটি অটো রিকশা গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ে প্রথমে বিরোধের সূত্রপাত হয়। প্রাইভেটকারে থাকা পাঁচ যুবক তখন মাদকাসক্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
র্যাব কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার আলাউদ্দিন সরাসরি আলতাফ হোসেনের ওপর হামলা করে। জিহাদ চাকু দিয়ে তাঁকে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। আপন ওই এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের মূল হোতা বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। সে এসএস পাইপ দিয়ে আলতাফ হোসেনের মাথায় গুরুতর আঘাত করে। ইমরানও হামলাকারী দলের সঙ্গে থেকে মারধরে অংশ নেয়।
র্যাবের ভাষ্য, হামলার সময় ঘটনাস্থলে থাকা সন্ত্রাসী দলের সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন ছিল। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশের কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযান চলছে
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার আট আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য আসামিদেরও শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
র্যাবের দাবি, ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস হলেও এটি কোনো পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সদস্যকে হত্যার ঘটনা নয়। তুচ্ছ একটি বিরোধ তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সংঘর্ষ ও গণপিটুনিতে রূপ নেয়। সেই হামলাতেই প্রাণ হারান পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই আলতাফ হোসেন।








