রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় সাংবাদিক নির্যাতন বেড়েছে, আগস্টে আক্রান্ত ৬৭ জন
হামলা ৬৩.৬ শতাংশ, মামলা মাত্র ৪.৫ শতাংশ

সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা যেন থামছেই না। বরং গত মাসে এ ধরনের ঘটনায় আরও অবনতি হয়েছে পরিস্থিতির। বেসরকারি সংস্থা মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্টের (মিড) সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগস্টে দেশের ২৬ জেলায় ৪৪টি পৃথক ঘটনায় ৬৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল শারীরিক হামলা। অথচ ঘটনার বিপরীতে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়েছে মাত্র দুটি, যা মোট ঘটনার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
মিডের পর্যবেক্ষণ বলছে, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু ঘটনার সংখ্যাই নয়, একেকটি ঘটনায় একাধিক সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের সবচেয়ে বড় ধরন ছিল শারীরিক হামলা। মোট ৪৪টি ঘটনার মধ্যে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘটনায় সাংবাদিকরা সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন। এর বাইরে হুমকি, হেনস্তা, হত্যার হুমকি ও অপহরণের অভিযোগও রয়েছে।
সংবাদ সংগ্রহ কিংবা ভিডিও ধারণের সময়ই বেশির ভাগ হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে জানিয়েছে মিড।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা
জেলাভিত্তিক হিসাবে সাংবাদিক নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। আগস্টে ঢাকায় মোট নয়টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সঙ্গে পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও রয়েছে।
এ ছাড়া বরিশাল, শরীয়তপুর ও সিলেটে তিনটি করে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। দেশের আরও কয়েকটি জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিডের পর্যবেক্ষণে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। মোট ঘটনার ২২ দশমিক ৭ শতাংশে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নাম মিলিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশও অভিযোগের বাইরে নয়
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আগস্টে চারটি ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতনের সরাসরি অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে মিড।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১১ আগস্ট রাঙামাটিতে এক সাংবাদিককে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ওই সাংবাদিক মুক্তি পাননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে।
১২ আগস্ট নাটোরের লালপুরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ছয় সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। একসঙ্গে ছয় সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ায় এটিকে আগস্টের সবচেয়ে বড় দলগত হামলার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে মিড।
এ ছাড়া সাতক্ষীরায় সংবাদ সংগ্রহের সময় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) পক্ষ থেকে এক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
৩৯ শতাংশ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থাই হয়নি
সাংবাদিক নির্যাতনের পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে মিডের পর্যবেক্ষণে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৯ শতাংশ ঘটনায় কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় মামলা তো দূরের কথা, সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়নি।
অন্যদিকে মোট ঘটনার ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশে থানায় জিডি করা হয়েছে। আর আনুষ্ঠানিক মামলা হয়েছে মাত্র দুটি ঘটনায়, যা মোট ঘটনার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনার পরও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা না নেওয়াকে সাংবাদিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছে মিড। সংস্থাটির মতে, অভিযোগ নথিভুক্ত না হওয়া কিংবা কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা জবাবদিহির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
পত্রিকার সাংবাদিকই বেশি আক্রান্ত
গণমাধ্যমের ধরন অনুযায়ী আগস্টে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকরা। মোট আক্রান্ত সাংবাদিকের ৫২ দশমিক ২ শতাংশই দৈনিক পত্রিকায় কর্মরত।
এরপর টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক রয়েছেন ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের হার ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
মিডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ঝুঁকির মাত্রা এখনও যথেষ্ট বেশি। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে।
গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনাকে শুধু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট হিসেবে দেখছে না মিড। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব ঘটনা দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের।
মিডের নির্বাহী পরিচালক রাশেদুল হাসান বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনা শুধু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য নয়, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক। সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত নথিভুক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
মিডের আগস্টের পর্যবেক্ষণ বলছে, একদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে এসব ঘটনায় আইনি প্রতিকার মিলছে খুব কম। ফলে মাঠে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা দুটিই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।








