‘আমরাও যেন ফ্যাসিস্ট হয়ে না উঠি’; নেতাকর্মীদের সতর্ক করলেন আইনমন্ত্রী
ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন ঠেকানোর আহ্বান

ফ্যাসিবাদ যেন দেশে আবারও পুনর্বাসিত হতে না পারে, একই সঙ্গে নতুন করে কেউ যেন ফ্যাসিস্ট হয়ে না ওঠে—এ জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়; যারা অন্যায় ও হত্যাকাণ্ড দেখেও চোখ বন্ধ করে আছেন, তাদের চোখ খুলতে হবে। নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ববোধ নিয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে।
বুধবার রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ফ্যাসিবাদ যাতে আবার পুনর্বাসিত হতে না পারে এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন ফ্যাসিস্ট হয়ে না ওঠে, সে জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়। যারা ফ্যাসিস্টদের খুন-খারাপি দেখছেন না, তাদের বলব আপনারা চোখ খুলুন। আল্লাহ প্রদত্ত দুটি চোখ খুলুন। তা যদি না পারেন, অন্তর চক্ষু খুলুন। তাহলে দেখতে পাবেন।’
‘চোখে আলো আছে, অথচ অন্যায় দেখতে পান না’
দেশের মানুষের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ মানুষের চোখে আলো আছে। কিন্তু যারা দেশ গঠন ও মানবিক মূল্যবোধের কথা বলার কথা, তাদের অনেকে মানুষের অধিকার দেখতে পাচ্ছেন না। তারা আত্মকেন্দ্রিকতায় ভুগছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাঁদের প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকালে সততা ও মানবিকতার ছাপ দেখা যায়। অথচ সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের চোখে আলো রয়েছে; কিন্তু তাঁরা মানুষের অধিকার ও অন্যায় দেখতে পান না।
তিনি বলেন, ‘অন্ধকে আলো দেওয়ার মতো ভালো কাজ আর কিছু হতে পারে না।’ ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিভা বিকাশে কাজ করছে। তিন বছর আগে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদেরও এ কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, তারাও মানুষ এবং তাদেরও অধিকার রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ওই সময় ২০ দিনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৩০০ মানুষ হাত, পা কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীর মাথার একটি অংশ নেই। এত ঘটনা ঘটলেও চোখে আলো থাকা অনেক মানুষ এখনো বলছেন, কিছুই হয়নি।
তিনি বলেন, ‘মানুষের মতো মুখ আছে, কিন্তু মানুষের মুখোশ পরে রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারের নামে মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কারও ভাই, কারও বোন, কারও মা, কারও স্বামী এখনো নিখোঁজ। অথচ তাদের চোখে আলো রয়েছে।’
‘চোখ খুলুন, দায়িত্ব পালন করুন’
যারা ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন, তাঁদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, তাঁরা যেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে চোখ খুলে অন্যায় চিহ্নিত করেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা যে যেখানে থাকুন, চোখ খুলুন। আমরা যদি অপরাধ করি, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিন। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি আপনাদের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করলে বাংলাদেশ একদিন আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ভূমি হিসেবে গড়ে উঠবে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুল হতে পারে। তবে সেই ভুল সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
‘একসঙ্গে হাঁটতে হবে’
জন্মভূমির প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও ভালোবাসার কথা তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘জননী এবং জন্মভূমির থেকে আপন কিছু নয়। কখনো কখনো জন্মভূমি জননীর থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায়।’
দেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন, একসঙ্গে হাঁটি, একসঙ্গে চলি। দেশ গড়ার কাজে আমরা মনোনিবেশ করি।’
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের পাশে থাকার আহ্বান
অনুষ্ঠানে ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কার্যক্রমের প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটি নীরবে একটি শ্রেণির মানুষকে স্বাবলম্বী করে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তাদের প্রতিভা বিকাশে এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও কিছু করার সুযোগ রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই শুভকাজের অংশীদার হতে না পারলেও পাশে থেকে সহযোগিতা করতে পারে। এ বিষয়ে তিনি নিজে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান।
অনুষ্ঠানে আয়োজকেরা জানান, সারা দেশ থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক বিভাগে শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, হামদ ও নাতে রাসুল (সা.) এবং রচনা প্রতিযোগিতায় তারা অংশ নেন। এ বছরের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল—‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা’।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সভাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম নুরউদ্দিন খান, ইরান দূতাবাসের প্রথম কাউন্সেলর এসরাফিল আমিরি গোর্জাদ্দিনি, ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান এরশাদ ফয়েজ এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক। অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।







