১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার: শফিকুর রহমান
‘২০২৪ আন্দোলন চূড়ান্ত যুদ্ধ নয়, ছিল মহড়া’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, গত ১৫ বছর যে পথে ফ্যাসিবাদী সরকার হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনকে চূড়ান্ত যুদ্ধ মনে করার সুযোগ নেই; সেটি ছিল চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি বা মহড়া। ওই আন্দোলনে জেগে ওঠা মানুষ এখনো সজাগ রয়েছেন এবং যেকোনো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তারা আবারও প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
রোববার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মিলনায়তনে সীরাতুন্নবী (সা.) সেমিনার ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে যারা জেগে উঠেছিলেন, তারা মারা যাননি কিংবা ঘুমিয়ে পড়েননি। তারা সজাগ দৃষ্টিতে দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মূল যুদ্ধের আগে বাহিনী প্রস্তুত করা হয়, কসরত ও মহড়া দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনকে সেই অর্থে চূড়ান্ত যুদ্ধ না ভেবে চূড়ান্ত যুদ্ধের মহড়া হিসেবে দেখার কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের পর আশা করা হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ফ্যাসিবাদের পঙ্কিলতা, ময়লা ও আবর্জনা পরিষ্কার হবে। কিন্তু তা হয়নি; বরং আবর্জনার পরিমাণ আরও বেড়েছে।
‘ফ্যাসিবাদ একটি সংক্রামক ব্যাধি’
জামায়াতের আমির বলেন, ফ্যাসিবাদ একটি সংক্রামক ব্যাধির মতো। এটি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সংক্রমিত হয়। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর এই ভাইরাস ভর করবে, সেই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকার যে রাস্তায় হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই রাস্তা ধরেই হাঁটছে। এই রাস্তা পরিবর্তন করতে হবে। তার ভাষায়, এটি ফ্যাসিবাদীদের রাস্তা, আয়নাঘরের রাস্তা এবং অসংখ্য মানুষকে বিনা বিচারে হত্যার রাস্তা।
বাংলাদেশের মানুষ কাউকে ওই পথে চলতে দেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই জাদুঘর থেকে ইতিহাস সরানোর অভিযোগ
জুলাই জাদুঘর থেকে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সরিয়ে ফেলার অভিযোগও করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সচেতন নাগরিকদের প্রত্যেকেরই এই জাদুঘর পরিদর্শন করা উচিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সেখানে জাতির দুঃখের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু একটি বিশেষ দেশ ও রাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য এর অনেক উপাদান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের আমির বলেন, ১৯৪৬ বা ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত অনেক পুরোধা ব্যক্তিত্বের তথ্য সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল। পরে এর অনেক কিছু গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের হাতে জাদুঘর হস্তান্তরের সময় সেখানে নির্যাতিত মানুষের অনেক স্মৃতিচিহ্ন ও ছবিও ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট দলের লোকদের স্মৃতি রেখে অন্যদের স্মৃতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তাকে প্রায় ২০০ দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল এবং তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার নাম নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন। তার একটি স্মৃতিও জাদুঘর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত ফেলানী খাতুনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সীমান্তে ফেলানীকে অমানবিকভাবে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই স্মৃতিও জাদুঘর থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
‘সবাই ইতিহাস বিকৃতির নায়ক’
ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতার সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, ক্ষমতায় আসা প্রতিটি পক্ষই অভিযোগ করে যে আগের সরকার ইতিহাস বিকৃত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, ক্ষমতায় এসে সবাই কোনো না কোনোভাবে ইতিহাস বিকৃতির নায়ক হয়েছে।
তিনি বলেন, এই অপকর্ম থেকে কেউ বের হতে পারেনি। ইতিহাসকে নিজের মতো করে উপস্থাপনের এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও পাসপোর্টের শক্তি নিয়েও বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ প্রত্যাশিতভাবে এগোতে পারেনি। বিশ্বের কাছে একটি দেশের মানুষের সম্মানের অন্যতম মানদণ্ড হলো সেই দেশের পাসপোর্টের শক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান এখনো হতাশাজনক।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আনম রফিকুর রহমান মাদানীর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।







