‘সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের’ নির্দেশেই চালানো হয় নৃশংসতা: ট্রাইব্যুনাল
রামপুরা-বনশ্রী হত্যাকাণ্ড

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় আন্দোলনরত নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর ‘সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের’ নির্দেশ ছিল বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালের মতে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র জনতার বিরুদ্ধে নৃশংস হামলা ও গুলিবর্ষণ চালান। বুধবার প্রকাশিত ১৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
গত ২৮ জুন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। বুধবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম মইনুল করিম পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিলেন। তাদের ছত্রভঙ্গ বা নিয়ন্ত্রণে আনার পরিবর্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশেই ওই এলাকায় সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগ করা হয়।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, রামপুরা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ওই এলাকায় নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। তিনি নিজেও ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেছেন।
অপরাধের ধরণ, ব্যাপকতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তিন আসামিই বর্তমানে পলাতক।
রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বনশ্রী মসজিদের সামনে জুমার নামাজ শেষে মো. নাদিম হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। একই সময় নিজ বাড়ির কলাপসিবল গেটের ভেতরে থাকা মায়া ইসলামও গুলিবিদ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয় মায়া ইসলামের সাত বছর বয়সী নাতি বাসিত খান মুসা।
একই দিনে রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবক আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তারিকুল ইসলাম পলাতক থাকলেও চঞ্চল চন্দ্র সরকার বিচারিক হেফাজতে ছিলেন।
চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে তুলনামূলক কম সাজা দেওয়ার কারণও পূর্ণাঙ্গ রায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, ভুক্তভোগী আমির হোসেন প্রাণে বেঁচে গেছেন এবং চঞ্চল চন্দ্র সরকার শুরু থেকেই কারাবন্দি অবস্থায় বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি ছিলেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। কিন্তু রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে যে মাত্রায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। সেই কারণেই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপ করা হয়েছে।









