ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে পারে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা: রয়টার্স
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের বার্তা

ভারতে নির্বাসনে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাসনে থাকা দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও দেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার ঝুঁকি থাকলেও তিনি দেশে ফিরবেন। পাশাপাশি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের বার্তাও দেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা। এর আগে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও সরাসরি সাক্ষাৎকার দেননি।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যা করা হতে পারে। তবুও তিনি দেশে ফিরবেন। তার ভাষায়, দলের নেতা-কর্মীরা চরম নিপীড়নের শিকার। যদি মৃত্যু আসে, তবে সেটি তিনি নিজের দেশের মাটিতেই চান, যেখানে তার বাবা-মা শায়িত আছেন।
গত নভেম্বরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে তিনি বরাবরের মতোই হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত আনার জন্য ভারতকে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে তাকে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজন হবে না, কারণ তিনি নিজেই দেশে ফিরবেন। তবে ঠিক কবে ফিরবেন কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি।
বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করেন। বিচার শুরু হলে জনগণ নিজেরাই বুঝতে পারবে এই বিচার কতটা প্রহসনমূলক। সেটিই তিনি প্রমাণ করতে চান।
সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দেশে ফেরা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার, ভারত কিংবা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তার কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। তার ভাষায়, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় হতে পারে না।
কারাগারে যেতে হলে তা নিয়েও তার কোনো উদ্বেগ নেই বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতেও একাধিকবার তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় এবং ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন।
ক্ষমতায় টানা দেড় দশক থাকার পর কেন দেশ ছাড়তে হয়েছিল, সে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার সরকারি বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসার পর জীবন রক্ষার তাগিদেই তিনি দেশ ছাড়েন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতে পারে, কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দের বিচার করার অধিকার জনগণের, সেই বিচার তিনি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিতে চান।
সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, দেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও সংগঠনকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাকে সাজা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে এবং তিনি হয়তো আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে জনগণই ভোটের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত দেবে।
রয়টার্স জানায়, শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও ভারতে অবস্থান করছেন এবং তার বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তার বা আওয়ামী লীগের অন্য শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র কিংবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।









