জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিএনপি নেত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ ছাত্রদলের

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ‘পরিকল্পিত ডিজাইন’ এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে ‘আবেগের বশে’ সংঘটিত বলে মন্তব্য করায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিলুফার চৌধুরী মনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নেটিজেন, জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী এবং বিভিন্ন মহল এটিকে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের অবমূল্যায়ন বলে মন্তব্য করছেন। এরই মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব প্রকাশ্যে মনির বক্তব্য ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ করে ভবিষ্যতে আরও সংযত ও শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটি টেলিভিশন টকশোতে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিলুফার চৌধুরী মনি দলীয় নেতাকর্মী, জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
গত ১ জুলাই চ্যানেল আইয়ের একটি টকশোতে অংশ নিয়ে নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান ছিল একটি "পরিকল্পিত ডিজাইন" এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু শিক্ষার্থী "আবেগের বশে" এতে যুক্ত হয়েছিল। তার এই মন্তব্য প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, এই বক্তব্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবন দেওয়া শহীদ, আহত এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেউ কেউ মন্তব্যটিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলেও দাবি করেন।
এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার (২ জুলাই) জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে নিলুফার চৌধুরী মনির বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি লেখেন, "প্রিয় নিলোফার চৌধুরী মনি আপা, এমপি আপনি দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের সারথি ছিলেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনার অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গতকাল টকশোতে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আপনার অযাচিত বক্তব্যে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ। আপনার বক্তব্য আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলাম।"
রাকিব বলেন, তারা বিশ্বাস করেন নিলুফার চৌধুরী মনি জুলাইয়ের চেতনায় বিশ্বাসী এবং দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিক। সেই কারণে তার মতো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও সংযত বক্তব্য প্রত্যাশিত।
তিনি আরও লেখেন, "আমরা অবগত রয়েছি, আপনি জুলাইয়ের চেতনা ধারণকারী একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ। সেহেতু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বক্তব্যে আপনি আরও বেশি সংযত ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন, সেই প্রত্যাশা করি।"
ছাত্রদল সভাপতির এই বক্তব্যের পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং জাতীয় স্মৃতি ও আত্মত্যাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন।
টকশোতে কী বলেছিলেন নিলুফার মনি, কেন তৈরি হয়েছে বিতর্ক
বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১ জুলাই একটি টেলিভিশন টকশোতে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে নিলুফার চৌধুরী মনির দেওয়া বক্তব্যকে ঘিরে।
আলোচনার একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের সময় তার কাছে আশ্রয় নেওয়া এক ব্যক্তি তাকে জানিয়েছিলেন, গুলির উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বলেছিলেন, কোথা থেকে গুলি আসছিল তা বোঝা যাচ্ছিল না এবং সামনেও কোনো পুলিশ দেখা যাচ্ছিল না, তবু গুলি এসে মানুষকে বিদ্ধ করছিল।
এই বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সোমা ইসলাম মন্তব্য করেন, "তাহলে তো এটা জুলাই ডিজাইন।" তিনি আরও বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা হয়তো একটি পরিকল্পিত ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।
টকশোতে নিলুফার মনি ওই মন্তব্যের তাৎক্ষণিক বিরোধিতা করেননি। বরং আলোচনায় তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আবেগের বশে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল এবং পুরো ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত কোনো দিক ছিল কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তার এসব বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়।
সমালোচকদের দাবি, উপস্থাপকের "জুলাই ডিজাইন" মন্তব্যের প্রতিবাদ না করে আলোচনাকে সেদিকে এগিয়ে নেওয়ায় নিলুফার মনির বক্তব্য এমন একটি ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত বিভিন্ন বিতর্কিত বয়ানের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকেই এটিকে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের অবমূল্যায়ন বলেও মন্তব্য করেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে দাবি করা হয়, আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে টকশোতে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব পোস্টে বলা হয়, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের ছোড়া গুলি সামনে থাকা কাউকে ভেদ করে বা পাশ কাটিয়ে পেছনে থাকা ব্যক্তির শরীরেও আঘাত করতে পারে। তাই কেবল গুলির দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুরো আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা যৌক্তিক নয় বলে তারা মত দেন।







