অখণ্ড পাকিস্তানপন্থীদের কেন মন্ত্রী-এমপি বানিয়েছিল বিএনপি, প্রশ্ন জামায়াত নেতার
মির্জা ফখরুলের সমালোচনার কড়া জবাব

বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের কেন স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বানিয়েছিল বিএনপি। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে বিএনপি বারবার 'মীমাংসিত' একাত্তরের ইস্যু সামনে এনে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গত রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছিলেন, এখনো সময় আছে দলটির নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে অবস্থান স্পষ্ট করার।
মির্জা ফখরুলের ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "যে ভাষায় বাইরে এবং সংসদে আপনারা কথা বলেন, প্রশ্ন করেন, তাহলে আমাদেরও তো প্রশ্ন আছে। সেই জবাবটা বিএনপিকে দিতে হবে।"
তিনি দাবি করেন, স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় এসে অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন এমন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য করেছে, যারা পাকিস্তান আমলে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন না। এ বিষয়ে বিএনপির কাছে জবাব চান তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, "বিএনপি মহাসচিবের মাথায় মাঝে মাঝেই ভূত চাপে। কিছুদিন পরপরই ৫০-৬০ বছর আগের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয় সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়।"
তিনি আরও বলেন, সে সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থানের ব্যাখ্যা জাতির সামনে দিয়েছে। সেই ব্যাখ্যা কারও পছন্দ হতে পারে, নাও হতে পারে। এটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে সেই পুরোনো বিষয়কে বারবার সামনে এনে বর্তমান রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিগত দুই দশকের বেশি সময় বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গে চার দলীয়, ১৮ দলীয় ও ২০ দলীয় জোটে রাজনীতি করেছে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তখন বিএনপির মনে একাত্তরের প্রশ্ন ছিল না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় গোলাম আযমের বাসায় গিয়ে জামায়াতের সমর্থনও চেয়েছিল বিএনপি নেতারা। এখন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সেই ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জামায়াত নিঃস্বার্থভাবে বিএনপিকে সরকার গঠনে সহায়তা করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। "এটাই কি বিএনপিকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিদান?"— প্রশ্ন রাখেন জামায়াতের এই নেতা।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার মতো যৌক্তিক যুক্তি না থাকায় বিএনপি বারবার একাত্তরের প্রসঙ্গ টেনে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এতে কোনো রাজনৈতিক লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকাও সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি অভিযোগ করেন, কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মতো করে সংবাদ প্রকাশ করছে, যা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, "যদি কোনো গণমাধ্যম বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে থাকে, তাহলে সেটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া উচিত।"
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এসব গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের পক্ষ নিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তারা অবস্থান বদলেছে। গণমাধ্যমকে সত্য, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।







