কার্নিশে ঝুলন্ত তরুণকে গুলি: হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
এএসআই চঞ্চলের ২০ বছরের কারাদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে প্রাণ বাঁচাতে ঝুলে থাকা এক তরুণকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং একই ঘটনায় আরও দুজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
এ ছাড়া রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার আরেক আসামি রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার আগে সকাল ১১টা ৪৮ মিনিটে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনান। এরপর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম অভিযোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন।
রায় ঘোষণার কার্যক্রম শুরুর আগে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি চান। ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করলে রায়ের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
এদিন সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে গ্রেপ্তার থাকা একমাত্র আসামি, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার বাকি চার আসামি পলাতক রয়েছেন।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলির হাত থেকে বাঁচতে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেন আমির হোসেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে ধাওয়া করে ভবনের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভবনের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন। সেই অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। গুরুতর আহত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
একই দিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে আরও দুজন নিহত হন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলার বিচার শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।
ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল। উপস্থাপিত সাক্ষ্য, ভিডিওচিত্র, আলামত এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেই আদালত এ রায় দিয়েছেন।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রায় যুক্ত হলো।








