নতুন সরকারের ১০০ দিনে ২৪৯ খুন, শতাধিক পরিবারে শোক
প্রশ্নে জননিরাপত্তা, আতঙ্কে জনজীবন

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৭ বছরের রামিসা আক্তার রাইসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা, গাজীপুরে একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা কিংবা নওগাঁয় তিন বছরের শিশুসহ চারজনকে হত্যার মতো ঘটনাগুলো নতুন করে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে দেশজুড়ে অন্তত ২২৯টি হত্যাকাণ্ডে প্রাণ গেছে ২৪৯ জনের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকে ২৭ মে পর্যন্ত সময়ের প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে ‘হত্যা’, ‘খুন’, ‘ধর্ষণের পর হত্যা’, ‘গলা কেটে হত্যা’, ‘হত্যাচেষ্টা’ সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়। আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা বাদ দিয়ে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে হত্যার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বাড়ছে হত্যাকাণ্ড, বাড়ছে উদ্বেগ
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার। সরকারের প্রথম ১০০ দিনে বিভিন্ন খাতে নীতিগত ও প্রশাসনিক কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধারণ মানুষের চোখে তেমনভাবে ধরা পড়েনি। বরং বিভিন্ন স্থানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পারিবারিক হত্যার ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির শেষ ১২ দিনে ১৩টি ঘটনায় ১৪ জন নিহত হন। মার্চ মাসে ৪২টি ঘটনায় খুন হন ৪৩ জন। এপ্রিলেই হত্যাকাণ্ড বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩টিতে। অর্থাৎ ওই মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর মে মাসের প্রথম ২৭ দিনেই ৯৮টি ঘটনায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।
এপ্রিলের শেষদিকে একাধিক ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০ এপ্রিল রাতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক নারী ও তার নবজাতকের গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং গাজীপুরে একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি করে।
খুন হওয়াদের বড় অংশ তরুণ ও শিশু
১০০ দিনে নিহত ২৪৯ জনের মধ্যে ৫১ জনের বয়স ১৭ বছরের কম। এর মধ্যে কয়েকজনের বয়স মাত্র দুই মাস। বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট নিহতদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। ২ মাস থেকে ৩০ বছর বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১১৫ জন, যা মোট হত্যার প্রায় ৪৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও তরুণদের ওপর সহিংসতার এই প্রবণতা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পারিবারিক বিরোধ, মাদক, যৌন সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতা মিলিয়ে তরুণ জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলোতে ৮৫টির বেশি হত্যাকাণ্ডে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। যা মোট হত্যাকাণ্ডের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। নরসিংদীতে ধর্ষণের পর কিশোরী হত্যা, গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা এবং রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়।
হত্যার সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। সেখানে ৫০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা মোট ঘটনার ২২ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রংপুর ও বরিশাল বিভাগে। দুই বিভাগেই ৯টি করে হত্যার ঘটনা পাওয়া গেছে। এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ১১টি এবং সিলেট বিভাগে ১৩টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে ২৫টি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
ধর্ষণ, মাদক ও পরকীয়ার জেরে হত্যাকাণ্ড
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ২২টি ঘটনায় ধর্ষণের আগে বা পরে ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ২৩টি ঘটনায় মাদক সংশ্লিষ্ট বিরোধ বা মাদকাসক্ত অবস্থায় হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়াজনিত বিরোধকে কেন্দ্র করে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা বা পারিবারিক সদস্যরা জড়িত ছিলেন।
১০০ দিনে খুন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৩ জনই নারী ও ৮ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ মোট ভুক্তভোগীর ৩৭ শতাংশ নারী ও শিশু।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের এমন ধারাবাহিক বৃদ্ধি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে নৃশংস অপরাধ বাড়তে থাকায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তীব্র হচ্ছে।
তাদের মতে, শুধু অভিযান বা বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তার দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, সামাজিক প্রতিরোধ, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা।
সরকারের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—হত্যাকাণ্ড কমিয়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ দ্রুত দৃশ্যমান হোক।








