সাত দিনে ১১ খুন, ১৩ ধর্ষণ; ভয়ের জনপদ হয়ে উঠছে দেশ?
শিশু থেকে নারী… কেউ নিরাপদ নয়!

হত্যা, ধর্ষণ আর নৃশংস সহিংসতার লাগামহীন বিস্তারে দেশ যেন ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ অনিরাপত্তার জনপদে পরিণত হচ্ছে। শিশু-কিশোরী, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, নারী—কেউই যেন আর নিরাপদ নয়। রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, রামপুরায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, চট্টগ্রামে চার বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার।
শুধু ধর্ষণ নয়, কুমিল্লায় ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে ভাই খুন, বাগেরহাটে বিএনপি কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা ও ডান হাত কেটে ফেলা, রাজধানীতে মাথাবিহীন লাশের সাত টুকরো উদ্ধার—এসব ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
‘দ্য বিডিপলিটিক্স ওয়াচ’এর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত ১৪ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত হয়েছে অন্তত ১১টি খুন ও ১৩টি ধর্ষণের ঘটনা। এছাড়াও একই সময়ে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৭টি অজ্ঞাত ও অর্ধগলিত মরদেহ। আইনশৃঙ্খলাবিদদের আশঙ্কা, লজ্জা, ভীতি ও প্রভাবশালীদের চাপে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। যথাযথ বিচার না হওয়ায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ।
ধর্ষণের ভয়াবহ চিত্র: শিশুই সবচেয়ে বেশি শিকার
গত সাত দিনের ধর্ষণের ঘটনাগুলো নৃশংসতার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। শিশু ও কিশোরীরাই হয়েছে মূল টার্গেট।
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি মাথা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল মরদেহ। প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ ঘটনার সাত ঘণ্টার মধ্যেই তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও এই ঘটনা ইতোমধ্যে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এর বাইরে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় ৪ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে। অভিযুক্তকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। পাবনার চাটমোহরে ‘ঘর ঝাড়ু দেওয়ার বিনিময়ে খাবার কিনে দেওয়ার’ প্রলোভন দেখিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছে ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আবদুল জলিল।
ভোলায় পঞ্চম শ্রেণির আরেক ছাত্রীকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। সাভারেও একই বয়সী শিশুকে দোকানে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও নিরাপদ নয়। কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরের একটি মাদ্রাসায় ১৩ বছরের এক ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ওই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনা জানাজানি হলে অভিযুক্ত শিক্ষককে রাতের আঁধারে এলাকা ছেড়ে যেতে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া বগুড়ায় পাঁচ বন্ধু মিলে মদপান করে তাদেরই বান্ধবীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছে, পটুয়াখালীতে রাতে সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ, রাজশাহীতে সাধুর আস্তানায় স্বামীর সহযোগিতায় নারীকে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ।
হত্যাকাণ্ডের মিছিল: প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন থেকে শুরু করে খণ্ডিত লাশ
ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোও সমান নৃশংস ও চাঞ্চল্যকর। গাজীপুরের টঙ্গীতে সাবেক স্বামীর ছুরিকাঘাতে নাজমিন নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে আহত হয়েছেন বর্তমান স্বামী। শেরপুরে ‘বোনকে নিয়ে প্রেমঘটিত দ্বন্দ্বের’ জেরে বন্ধুকে গলা কেটে হত্যা করেছে আরেক বন্ধু। মরদেহ মাথাবিহীন অবস্থায় পড়ে ছিল ঘাসক্ষেতে।
সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায়, যেখানে এক ব্যক্তির মাথাবিহীন সাত টুকরো খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরকীয়া প্রেমিকা ও বান্ধবী মিলে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাকে হত্যার পর মরদেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয়। শরীয়তপুরে স্ত্রী নিজের স্বামীকে হত্যার পর হাড়-মাংস আলাদা করে ফ্রিজে ভরে রেখেছিলেন। ভাড়াটিয়ার ফ্রিজে রাখতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ডিশ ব্যবসায়ী নাছিরকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, যেখানে দেখা গেছে রক্তমাখা ছুরি হাতে দুই সন্ত্রাসী দৌড়ে পালাচ্ছে। বাগেরহাটে বিএনপি কর্মী মিন্টু শেখকে কুপিয়ে হত্যা করার পর তার ডান হাত কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
চাঁদপুরে মাদকাসক্ত ছেলে নিজের মাকেই কাঠের টুকরো দিয়ে পিটিয়ে খুন করেছে। কুমিল্লা, বগুড়া, চট্টগ্রাম—সব জায়গায় একই চিত্র: মানুষের জীবন যেন মাটির টাকা।
নদীতে ভাসছে লাশ: রহস্য উন্মোচনে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ
গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৭টি মরদেহ। এর অধিকাংশেরই পরিচয় জানা যায়নি। নৌ পুলিশ এসব ঘটনায় তিনটি হত্যা ও ১১টি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করেছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এসব লাশের বেশিরভাগই আইনশৃঙ্খলা জট ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের শিকার, যাদের খবর গণমাধ্যমেও আসেনি।
জনমনে আতঙ্ক, প্রশাসন হিমশিম
ক্রমবর্ধমান এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তীব্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে ‘কঠোর ব্যবস্থার’ প্রতিশ্রুতি দিলেও, বিচারহীনতা ও দীর্ঘমেয়াদী মামলা প্রক্রিয়ার কারণে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা।
এমন প্রেক্ষাপটে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র। একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন না হলে কীভাবে এক সপ্তাহেই এত নৃশংস ঘটনা ঘটতে পারে—এখন এই প্রশ্নই ঘুরছে সাধারণ মানুষের মনে।
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা দায়ী?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতির জন্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অধিকাংশ আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়া, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় পুলিশ অনেক সময় শুরুতেই যথাযথ তৎপরতা দেখাতে ব্যর্থ হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে জনমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে আস্থাহীনতা বাড়ছে।
একই সঙ্গে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের দাবি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৌশল, মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একের পর এক ধর্ষণ, খুন, খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার কিংবা সংঘবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে যদি বাস্তবভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার ও অপরাধ দমনে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হতে পারে।








