ফ্যাসিবাদ ১৬ বছর টিকেছে 'আওয়ামী' কালচারাল ন্যারেটিভের কারণে: ফারুকী
ইলিয়াস আলী, আবরার ফাহাদদের নিয়ে কেন সিনেমা হয় না?

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ‘একদলীয় ন্যারেটিভ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী। তার দাবি, এই সাংস্কৃতিক বয়ানই দেশে ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— কেন ইলিয়াস আলী, আবরার ফাহাদ, মেজর জলিল কিংবা ভাসানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো বাংলাদেশের সিনেমা, উপন্যাস বা শিল্প-সাহিত্যে জায়গা পায় না।
বুধবার (১৩ মে) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এসব কথা বলেন তিনি। “কালচার নিয়া ছোট্ট আলাপ” শিরোনামের ওই লেখায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ‘সিলেকটিভ ইনক্লুশন’ ও ‘কালচারাল এক্সক্লুশন’-এর রাজনীতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন ফারুকী।
স্ট্যাটাসের শুরুতেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল এম এ জি ওসমানী কেন উপস্থিত ছিলেন না— এত গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর প্রশ্ন নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র বা উপন্যাস হয়েছে কি না। একইভাবে তিনি জানতে চান, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী খোলামেলা স্মৃতিচারণ করলেও এ বিষয়ে কেউ কাজ করেছেন কি না।
ফারুকী বলেন, মওলানা ভাসানীর ভূমিকা বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে কতটা জায়গা পেয়েছে, কিংবা রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, মেজর এম এ জলিলের জীবন ও বাহাত্তর-পরবর্তী নৈরাজ্য নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়েছে কি না— এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “যে শেরে বাংলা আমাদের পূর্বপুরুষদের জমিদারি শোষণ থেকে বাঁচিয়েছে, তাকে কি শিল্প-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে দেখেছেন?”
তিনি আরও বলেন, বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর গুম, সুমন বা আরমানের মতো ঘটনাগুলো নিয়েও কোনো কাহিনিচিত্র নির্মিত হয়নি। যদিও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ডকুমেন্টারি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং সেগুলো মানুষকে স্পর্শও করেছিল। কিন্তু মূলধারার ফিকশন চলচ্চিত্রে এসব বিষয় অনুপস্থিত।
ফারুকী প্রশ্ন তোলেন, “আপনি একালের আবরার ফাহাদকে নিয়ে একটা কাহিনীচিত্র হওয়ার সম্ভাবনা দেখেন?” এরপর নিজেই উত্তর দিয়ে বলেন, বর্তমান ইকোসিস্টেমে তিনি সেই সম্ভাবনা দেখেন না।
এর পেছনে দুটি কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি। প্রথমত, বাংলাদেশে এমন এক সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভের মধ্যে মানুষ বড় হয়েছে যেখানে এসব বিষয়কে ‘কালচারালি কুল’ বা ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে দেখা হয় না। দ্বিতীয়ত, কোনো শিল্পী এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে চাইলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ‘রাজাকার’ তকমা দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ ধরনের গল্পে অর্থায়ন বা প্রযোজনার ক্ষেত্রেও ‘গেটকিপিং’ কাজ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্ট্যাটাসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঘিরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উপলব্ধিরও সমালোচনা করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, নতুন কুঁড়ির জন্ম, নারীশিক্ষা ও নারীর কর্মসংস্থানে অবদান রাখার পরও জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে ‘কালচারালি কুল’ বা ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে দেখা হয় না। অন্যদিকে ১৯৭২-৭৫ সালের সহিংসতা, একদলীয় শাসন, গুম-খুন এবং পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকার পরও আওয়ামী লীগকে সাংস্কৃতিক পরিসরে ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ফারুকীর ভাষ্য, “এটাই হলো দ্য পলিটিকস অব কালচারাল এক্সক্লুশন অ্যান্ড সিলেকটিভ ইনক্লুশনের ফল।” তিনি দাবি করেন, আওয়ামীপন্থী মিডিয়া, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও একপেশে ইতিহাসচর্চাকারী বুদ্ধিজীবীরা গত ৫৪ বছর ধরে এই ধারণা তৈরি করেছেন।
তিনি বলেন, “এই কালচারাল পারসেপশন দিয়াই ফ্যাসিবাদ ১৬ বছর টিকছে, ইলিয়াস আলীকে গুম করছে, বেগম জিয়াকে জেলে বন্দি করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিছে, ব্যাংক লুট করছে।”
ফারুকীর মতে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে বিএনপি বা জামায়াতের কারও ওপর নির্যাতন হলেও তাদের সহানুভূতি তৈরি না হয়। এই সাংস্কৃতিক কাঠামোই আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াত কৌশলগত দূরত্ব না রাখলে আন্দোলনকেও “বিএনপি-জামাত” ট্যাগ দিয়ে দমন করা হতো।
তবে এই পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হবে না বলেও মন্তব্য করেন ফারুকী। তার ভাষায়, “চব্বিশকে অনেকে শুধু পলিটিক্যাল ইভেন্ট হিসেবে দেখলেও আমার বিবেচনায় এটা মূলত কালচারাল একটা ঘটনা। চব্বিশের পর বোতলের বন্দীদশা থেকে একবার যে জাতি মুক্তি পেয়ে গেছে, তাকে আবার সেই বোতলে ঢোকানো সম্ভব হবে না।”
তিনি আরও জানান, দায়িত্ব শেষ করার আগে তিনি তার উত্তরসূরির জন্য একটি বিস্তারিত “নোট টু সাকসেসর” রেখে গেছেন। সেখানে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তনের নানা দিক নিয়ে লিখিত পরামর্শ রয়েছে, যা তিনি ভবিষ্যতে প্রকাশ করবেন বলে জানান।
টিআই/







