কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে কেউ পার পাবে না। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে এর জন্য উচ্চ মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফর এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা বা গোপন সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা জাতির সামনে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তারা এখন তার পরিণতি ভোগ করছে। তাদের তো দিদি ছিল, আপনাদের কে আছে? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পাওয়া যাবে না। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দিন আগে চার দিনের সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। কী উদ্দেশ্যে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে কী অর্জন করে এসেছেন, তা জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো ধরনের লুকোচুরি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে জনগণ পরিষ্কার ব্যাখ্যা জানতে চায়।

জামায়াত আমির বলেন, তারা কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত দাবি নিয়ে রাজপথে নামেননি। এসব দাবি জনগণের দাবি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই দাবির পক্ষেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন। এর আগে দুটি লংমার্চ জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আজকের কর্মসূচিও সফল করার আহ্বান জানান।

সাত দফা দাবির প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এসব দাবির মূল বিষয় একটি—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। এই গণরায় বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই বাকি ছয় দফার জন্ম হয়েছে। একটি দফা বাস্তবায়ন করা হলে বাকি ছয় দফা সামনে আসত না বলে তারা বিশ্বাস করেন। গণরায় কার্যকর হলে চাঁদাবাজ, দখলদার, দুর্নীতিবাজ ও মাদক কারবারিরা মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পেত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি জাতিকে হতাশ করেছে এবং জনগণের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতারণা করেছে। তারা কথা দিয়ে কথা রাখেনি। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার করেছে এবং জাতির আকাঙ্ক্ষা ও গণরায়কে উপহাস করেছে। বিএনপিকে এই অবস্থান থেকে সরে এসে গণরায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছিল। অন্যথায় তাদের উচ্চ মূল্য দিতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। বিএনপি এখন সেই পরিণতির দিকেই এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপি অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়নি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে তারা প্রতিদিন নতুন নতুন জঞ্জাল জাতির জন্য তৈরি করছে। মানুষের কপালে যখন দুর্ভোগ লেখা থাকে, তখন সেই দুর্ভোগের ঠিকানায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তার শান্তি হয় না।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির উচিত দাবিগুলো মেনে নিয়ে সুস্থ ধারায় ফিরে আসা। আগামী ৯ তারিখ সংসদ অধিবেশন বসার আগেই নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতে হবে। বিএনপি যদি এই ঘোষণা দেয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের আর কোনো কর্মসূচি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

অন্যথায় আন্দোলন অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দাবি এবং ৭০ শতাংশ মানুষের ভোটকে কোনোভাবেই অপমানিত হতে দেওয়া হবে না। এ দাবি আদায় করেই তারা ঘরে ফিরবেন।

যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পদদলিত করা হচ্ছে। তাদের কারও ছলনায় কান দেওয়া যাবে না। তরুণরা রাজপথে লড়াই করে জাতিকে সাময়িক মুক্তি এনে দিয়েছে। সেই মুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে তাদের আবারও লড়াই করতে হবে।

দেশে আরেকটি বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে। সেই বিপ্লবের জন্য মুক্তিকামী দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ১১ দলীয় ঐক্যের আজকের লংমার্চ সফল করার আহ্বান জানান এবং কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা।