পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা। এ লক্ষ্যে পাকিস্তানের কাছে শুল্ক ও শুল্কবহির্ভূত বিভিন্ন বাণিজ্য বাধা দূর করার প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। আগামী ১ ও ২ ডিসেম্বর ইসলামাবাদে দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মদলের (জেডব্লিউজিটি) প্রথম বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে ওষুধ ও খাদ্যপণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং শুল্কায়ন ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেবে ঢাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বাধাগুলো তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে ওষুধ ও খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের মান, কারিগরি বিধিবিধান এবং স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত শর্ত (এসপিএস) নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হবে। এসব বাধা দূর হলে পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুযোগ পেলে ঢাকাকে মনের মতো করে সাজাতে চাইসুযোগ-পেলে-ঢাকাকে-মনের-মতো-করে-সাজাতে-চাই
বৈঠকে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য পাকিস্তানের বাজারে আরো বেশি প্রবেশাধিকার চাওয়া হবে। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে প্রধানত তুলা, বস্ত্রের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য, সিমেন্ট ক্লিংকার ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, চা, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তানের বাজারে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক জটিলতা দূর করা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্য সম্পর্ক আরো ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব হবে।
এদিকে পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দেশটি সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ঢাকাকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীকে আতিথ্য দিতে আগ্রহী।
এ সফরের সময় বাংলাদেশের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং পাকিস্তানের ট্রেডিং করপোরেশন অব পাকিস্তানের (টিসিপি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ চুক্তি সইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সংস্থার মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হতে পারে। এর আওতায় নিত্যপণ্য আমদানি-রপ্তানি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যৌথ কর্মদল বৈঠকের পাশাপাশি মন্ত্রী পর্যায়ের এ সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সুতা-কাপড় ও প্রস্তুত চামড়া ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়েছে, তার মূল্য ছিল ৬ কোটি ডলারের সামান্য বেশি। মূলত কাঁচা পাট, ওষুধ, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, চা ও তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। অন্যদিকে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তান বাংলাদেশে ৭১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে তাদের আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, যেকোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ও দর-কষাকষি হতে হবে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে। অর্থনৈতিক ভিত্তি বিবেচনায় না নিয়ে কোনো চুক্তি করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তুলনামূলক সুবিধা (কমপারেটিভ অ্যাডভান্টেজ) বিবেচনায় নিয়ে আমদানি-রপ্তানির কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ট্রেডের (জেডব্লিউজিটি) বৈঠকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য তুলনামূলক সহজে ও সাশ্রয়ীভাবে আমদানি করতে পারে, সেসব বিষয়ে দর-কষাকষিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একইভাবে যেসব পণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে, সেগুলোর বাজার সম্প্রসারণেও জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশকেই নিজ নিজ স্বার্থ বিবেচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে।
অধ্যাপক হেলাল আরো বলেন, বাণিজ্য আলোচনায় সব সময় সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিকে প্রধান বিবেচনায় রাখা ঠিক হবে না। কোনো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির বাজার ভালো থাকলে সেখানে আমদানি বাড়ানোর চিন্তা না করে রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আবার যে দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে তুলনামূলক সুবিধা পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে আমদানির বিষয়ে কার্যকর দর-কষাকষি করতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে পণ্যভিত্তিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের আলোকে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্কনীতির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করতে পারেননি। এর রাজনৈতিক মূল্যও তাকে দিতে হচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে।







